পবিত্র মাহে রমজান ২০১৯

Last updated: 18th Apr 2019, no comments, Written by Md. Alamin

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমাজান। মহান আল্লাহ পাক অপার করুণায় সয়লাব এ পবিত্র মাস, অধিকহারে বান্দার পাপরাশির মোচন হয়; বান্দা পায় মুক্তি ও পরিত্রাণের কাঙ্খিত সফলতা। রমাজান মাসের রোজা মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।

মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- ” হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা মুত্তাকী অর্জন করতে পারো।” রোজা ইসলামের ৫ টি মূলভিত্তির একটি। কেউ রমজান মাসের রোজাকে ফরয হিসেবে অস্বীকার করলে কিংবা রোজার প্রতি উপহাস বা বিদ্রুপ প্রকাশ করলে সে ঈমানহারা কাফির হয়ে যাবে। আর যে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে রোজা পালন করবে না, সে ফাসিক বা মস্তবড় গুনাহগার সাব্যস্ত হবে।

রোজার সুন্নাতসমূহ

১. শেষ রাতে সাহরী খাওয়া। এ সর্ম্পকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “তোমরা সাহরী খাও। কেননা, সাহরীর ভিতরে বরকত রয়েছে।” (মিশকাত শরীফ) ২. শেষ রাতে বিলম্বে সাহরী খাওয়া সুন্নাত। তবে এমন দেরি করবে না যাতে সুবহে সাদিক প্রকাশ পাওয়ার আশংকা হয়। ৩. সূর্য অস্ত যাওয়া মাত্রই তাড়াতাড়ি ইফতার করা। ৪. কোন খেজুর কিংবা ফলমূল দ্বারা ইফতার করা সুন্নাত। ৫. “বিসমিল্লাহি ওয়া’আলা বারাকাতিল্লাহ” বলে ইফতার করা।

রোজা ভঙ্গের কারনসমূহ

১. ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে। ২ স্ত্রী সহবাস করলে । ৩. কুলি করার সময় হলকের নিচে পানি চলে গেলে। ৪. ইচ্ছকৃত মুখভরে বমি করলে। ৫. নাকে বা কানে ওষধ বা তৈল প্রবেশ করালে। ৬. জবরদস্তি করে কেহ রোজা ভাঙ্গালে । ৭. ইনজেকশান বা স্যালাইনের মাধ্যমে দেহে ঔষধ পৌছালে। ৮. কংকর পাথর বা ফলের বিচি গিলে ফেললে। ৯. সূর্যাস্ত হয়েছে মনে করে ইফতার করার পর দেখা গেল সুর্যাস্ত হয়নি। ১০. পুরা রমজান মাস রোজার নিয়ত না করলে। ১১. দাঁত হতে ছোলা পরিমান খাদ্য-দ্রব্য গিলে ফেললে। ১২. ইচ্ছাকৃত লোবান বা আগরবাতি জ্বালায়ে ধোয়া গ্রহন করলে। ১৩.মুখ ভর্তি বমি গিলে ফেললে । ১৪. রাত্রি আছে মনে করে সোবহে সাদিকের পর পানাহার করলে।

সেহরি খাওয়ার নিয়ম

প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম নর-নারীর ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। আর রোজা রাখতে সেহরি খাওয়া সুন্নত করা হয়েছে। অনেকেই তারাতারি সেহরি খেয়ে নেন আবার অনেকেই একেবারেই শেষ সময়ে সেহরি খান। সেহরি খাওয়ার বিষয়ে কয়েকটি মাসআলা দেয়া হলো।

সেহরি খাওয়া সুন্নত। পেট ভরে খাওয়া জরুরি নয়, এক ঢোক পানি পান করলেও সেহরির সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। হাদিস শরিফে আছে, নবী কারিম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

তোমরা সেহরি খাও। কেননা সেহরিতে বরকত রয়েছে। (মুসলিম শরীফ ১/৩৫০)

অন্য বর্ণনায় আছে, সেহরি খাওয়া বরকতপূর্ণ কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিত্যাগ করবে না। এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও সেহরি কর। কারণ যারা সেহরি খায় আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন এবং তার ফেরেশতারা তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (মুসনাদে আহমদ ৩/১২মুসান্নাফে ইবনে আবী শয়বা ৯০১০সহি ইবনে হিব্বান ৩৪৭৬)

সেহরি সম্পর্কে হদিসে আরও এসেছে, সুবহে সাদিকের কাছাকছি সময়ে সেহরি খাওয়া মুস্তাহাব। এত দেরি করা মাকরুহ, কারণ সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২০০)

হাদিস শরিফে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সকল নবীকে (সময় হয়ে গেলে দেরি না করে) তাড়াতাড়ি ইফতার করতে আদেশ করা হয়েছে এবং সেহরি বিলম্বে খেতে বলা হয়েছে। (আলমুজামুল আওসাত ২/৫২৬,হাদিস ১৯০৫ মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/৩৬৮)

অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়। আমর ইবনে মায়মুন আলআওদী বলেন,

সাহাবায়ে কেরাম দ্রুত ইফতার করতেন আর বিলম্বে সেহরি খেতেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক,হাদিস ৭৫৯১মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা,হাদিস ৯০২৫)

রমযান হল ইসলামিক বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে নবম মাস, যে মাসে বিশ্বব্যাপী মুসলিমগণ ইসলামিক উপবাস সাওম পালন করে থাকে। রমজান মাসে রোজাপালন ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়তম।রমজান মাস চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে ২৯ অথবা ত্রিশ দিনে হয়ে থাকে যা নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই মাসে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির উপর সাওম পালন ফরয, কিন্তু অসুস্থ, গর্ভবতী, ডায়বেটিক রোগী, ঋতুবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে তা শিথিল করা হয়েছে।

রমজান মাসের ফজিলত

সিয়াম এর মাস শক্তি অর্জন ও দানের মাস। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম মক্কা বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তখন তিনি এবং সমস্ত মুসলমান সিয়াম অবস্থায় ছিলেন, আর এ রমজানেই বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়ছিল। এ সমস্ত যুদ্ধে ইসলামের পতাকা সমুন্বত হয়েছিল, মূর্তি এবং পৌত্তলিকতার পতাকা অবনমিত হয়েছিল। এ মাসে মুসলমানদের অনেক যুদ্ধ জিহাদ এবং কুরবানি সংঘঠিত হয়েছে।

রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা অধিক পরিমাণে শক্তি, সজিবতা এবং ইবাদতের জন্য ধৈর্য ধারণ করার উদ্যম অনুভব করতেন, তাইতো রমজান মাসকে সৎকাজ, ধৈর্য ও দানের মাস বলা হয়। রমজান দুর্বলতা, অলসতা, ঘুমানোর মাস নয়। কোন কোন সিয়াম পালনকারীকে হাত পা ছেড়ে দিয়ে, দিনের বেলায় ঘুমাতে, কাজ কম করতে দেখা যায়। এমন আচরণ সিয়ামের তাৎপর্যের বিরোধী। সিয়ামের উদ্দেশ্যের সাথে মিলে না।

পূর্বেকার মুসলমানেরা রমজান যাপন করতেন তাদের অন্তর এবং অনুভূতি দিয়ে। রমজান আসলে তারা কষ্ট করতেন। ধৈর্যের সাথে দিন যাপন করতেন। আল্লাহর ভয় এবং পর্যবেক্ষণের কথা তাদের স্মরণ থাকত। তার সিয়াম নষ্ট হয় অথবা ত্রুটিযুক্ত হয় এমন সব কিছু থেকে দুরে থাকতেন। খারাপ কথা বলতেন না, ভাল না বলতে পারলে নীরব থাকতেন।

তারা রমজানের রাত্রি যপন করতেন সালাত, কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনুসরণ করেই। সিয়ামের উপকার অথবা ফজিলত অনেক। তা গণনা করে শেষ করা যাবে না। তবে খেলাধুলা ও রং তামাশায় মত্তব্যক্তিরা কিংবা অলস শ্রেণির লোকজন যারা সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায়, এবং রাত্রে বাজারে ঘুরে বেড়ায় তারা রমজানের এসব ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকবে।

রোজার নিয়ত

نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقبل منى انك انت السميع العليم.
বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমা গদাম মিং শাহরি রমাদ্বানাল মুবারকি ফারদ্বল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাক্বব্বাল মিন্নী ইন্নাকা আংতাস সামীউল আলীম।

রোযার নিয়ত এর বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ পাক! আপনার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকালের রমাদ্বান শরীফ-এর ফরয রোযা রাখার নিয়ত করছি। আমার তরফ থেকে আপনি তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা , সর্বজ্ঞাত।

ইফতার-এর পরিচয় : ইফতার এর বাংলা অর্থ হল (ভঙ্গ করা)। সন্ধ্যা রাতে তথা মাগরিবের আযানের পর যে কোন হালাল খাবার দ্বারা পানাহারের মাধ্যমে রোযা ভঙ্গ করাকে ইফতার বলে ।

ইফতার-এর দোয়া

اللهم لك صمت و على رزقك افطرت
বাংলা উচ্চারণ: (আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।) বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিযিক্ব দ্বারা ইফতার করছি।

রোজার মাসে সহবাসের নিয়ম!

ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইফতারের পরে ঈশা পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বৈধ ছিল। যদি কেউ এর পূর্বে শূয়ে পড়তো তবে নিদ্রা আসলে পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ হারাম হয়ে যেত। এর ফলে সাহাবাগন কষ্ট অনুভব করছিলেন। অতপর আল্লাহ আয়াত নাজিল করে মাগরিব থেকে সুভহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগের আদেশ দান করেন।

রাসূল সা: বলেছেন, ইফতার তাড়াতাড়ি কর আর সেহরি বিলম্ব কর।হযরত আনাস রা: বলেন আমরা সেহরি খাওয়া মাত্রই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতাম।

এখানে একটা বিষয় জ্গাতব্য যে যেহেতু আল্লাহতায়ালা রোজাদারের জন্য স্ত্রী সহবাস ও পানাহারের সময় সুবেহসাদিক পর্যন্ত নির্ধারন করেছেন কাজেই সকালে যে ব্যাক্তি অপবিত্র অবস্হায় উঠলো সে পবিত্র হয়ে নামাজ আদায় করে রোজা পুরা করে নিল। যদি গোসল করতে গিয়ে পানাহারের সময় শেষ হয়ে যায় তাহলে ওজু করে সেহরি পুরা করে গোসল করে নামাজ আদায় করে নিবে। কাজেই আপনারা রাতে সহবাস করতে পারেন তবে মনে রাখবেন ফজরের নামাজের পুর্বে অবশ্যি নিজেকে পবিত্র করে নিতে হবে।

রমজান মাসে রোজা রাখা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ-

‘ফামান শাহিদা মিনকুমুশ্ শাহ্রা ফাল্ ইয়াসুম্হু’- অর্থাৎ যে ব্যক্তি রোজার মাসটি পাবে, তারই কর্তব্য হচ্ছে রোজা রাখা। [সূরা বাক্বারা : ১৮৫] আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনা শরিফে হিজরতের [জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে যাওয়া] আঠার মাসের মাথায় শাবান মাসে রোজা ফরজ হওয়ার এই বিধান অবতীর্ণ হয়। এজন্য রমজান মাসের রোজা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমান জাতির জন্য ফরজে আইন। অর্থাৎ ঐশী বিধিবদ্ধ দায়িত্ব ও বিধান। রমজান মাসে পূর্ণ মাস একজন বালেগ [প্রাপ্ত বয়স্ক], সুস্থ ও বিবেকসম্পন্ন মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর রোজা রাখা ফরজ। কুরআন-হাদিস, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা রোজার বিধান প্রমাণিত। আল্লাহপাক কুরআন মজিদে বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর [সূরা বাক্বারা : ১৮৩]। আল্লাহ্র নির্দেশিত এ রোজার বিধানকে যে অস্বীকার করবে এবং শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া যে রোজা রাখবে না, সে ফাসিক ও কবিরা গুনাহগার হবে (জঘন্য পাপী হিসেবে আল্লাহর কাছে ধিকৃত হবে)। মহানবীর (দ.) হাদিস বা বাণী থেকেও রোজার ফরজ হওয়া প্রমাণিত। হজরত আবু হোরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (দ.) বলেছেন, ‘তোমাদের নিকট রমজান মাস সমুপস্থিত। ইহা এক বরকতময় মাস। আল্লাহ তায়ালা এ মাসের রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন’। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রমজান মাসের রোজা রাখাকে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ বলা হয়েছে। রোজার অতীব আবশ্যকতা তথা এ ফরজ বিধানকে গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে প্রিয় নবী (দ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শরয়ি ওজর (যৌক্তিক অপারগতা) বা রোগ ব্যতীত রমজানের একটি রোজা ছেড়ে দেবে সে যদি পরবর্তীতে সারাজীবন ধরে রোজা রাখে তবুও তার ক্ষতিপূরণ হবে না। [হাদিসগ্রন্থ- আহমদ, তিরমিযি, আবু দাউদে- এ বর্ণনা রয়েছে]।

রোজার এবং রোমজানের ইতিহাস

ইসলামের পঞ্চ-স্তম্ভের অন্যতম একটি হলো রোজা। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। রোজা শুধু আমাদের ওপর ফরজ করেছেন তা কিন্তু নয় বরং আমাদের পূর্ববর্তী সবার ওপরই রোজার বিধান ছিল।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.) এর ওপর রোজার বিধান আরোপ করে মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম রোজার প্রচলন শুরু করেন এবং আমাদের পূর্ববর্তী সব নবী ও উম্মতের ওপরও রোজার বিধান আরোপ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পার। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (র.) স্বীয় তাফসির গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনি’তে উল্লেখ করেছেন যে, উপরোক্ত আয়াতে ‘মিনকাবলিকুম’ দ্বারা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রসুলের জামানা বুঝানো হয়েছে। কোরআন ও হাদিস গবেষণা করলে রোজার ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, মহান আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। এ ব্যাপারে দয়াময় আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ করেন, হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তসহ খেতে থাক, কিন্তু তোমরা এ গাছের কাছে যেও না। (যদি যাও বা তার ফল ভক্ষণ কর) তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৫)।

মুফাসসিরে কেরাম বলেন, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ওই গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং এর পরিণামে মহান আল্লাহতায়ালা তাদের ভূ-পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা উক্ত ভুলের জন্য যারপরনাই অনুতপ্ত হন, তওবা ইস্তিগফার করেন এবং এর কাফ্ফারাস্বরূপ ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন। হজরত আদম (আ.)-এর পর অন্য সব নবী-রসুলের জামানায়ও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল। হজরত নুহ (আ.) এর উপরও রোজা ফরজ ছিল; রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হজরত নুহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ)।

হজরত মুসা (আ.) এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহতায়ালা তার ওপর ওহি নাজিল করলেন এবং আরও দশ ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) একদিন পর পর রোজা রাখতেন।

মহানবী (সা.) মদিনায় আগমন করার পর শুধু আশুরার রোজা রাখতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে দেখলেন, মদিনার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা রাখছ? উত্তরে তারা বলল, আজ সেই দিন যেদিন মহান আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও তার কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন আর ফেরাউনকে সদলবলে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ এ দিন মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এ দিন রোজা রাখি। অতঃপর রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা তোমাদের থেকে মুসা (আ.) অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। (বোখারি, মুসলিম)।

সর্বোপরি ১০ শাবান দ্ব্বিতীয় হিজরিতে মহান আল্লাহতায়ালা রমজানের রোজা ফরজ মর্মে পবিত্র কোরআনে আয়াত নাজিল করেন। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের মাহে রমজানের রোজাগুলো সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাসিল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

অবশেষে ‘মাহে রমজানের আহ্বান’ নিয়ে আমার রচিত একটি ছড়া পাঠকদের খেদমতে উপস্থাপন করলাম— ‘বছর ঘুরে আসছে আবার রমজানেরই দিন, রাখবে রোজা পড়বে নামাজ সব মানব জিন।

বুঝবে সবাই গরিব-দুঃখীর ক্ষুধার কেমন জ্বালা, সবাই চাইবে অর্জিত হোক জান্নাতেরই মালা।’

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *