close(x)
 

টাইলস শ্রমিক থেকে যেভাবে কোটিপতি

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়নের চকবেড়া গ্রামে অজপাড়াগাঁয়ে গোলজারের দৃষ্টিনন্দন বাড়ি

আট বছর আগেও টাইলস মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। সারা দিনে মজুরি মিলত ২০০ টাকা। টিনের ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করতেন। চড়তেন সস্তা বাইসাইকেলে। তবে এখন ভাগ্য খুলেছে তাঁর। শানশওকতের শেষ নেই। অর্ধকোটি টাকার পাকা দালানে থাকেন। চড়েন মোটরসাইকেলে। তবে নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস নেই তাঁর। নেই ব্যবসা-বাণিজ্যও। চড়া সুদে টাকা খাটিয়ে মাত্র আট বছরের ব্যবধানে রীতিমতো কোটিপতি বনে গেছেন তিনি।

আট বছরে কোটিপতি বনে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম গোলজার হোসেন (৪০)। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চকবেড়া গ্রামের বাসিন্দা। সুদের টাকা তুলতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। সময়মতো টাকা না পেলে বাহিনীর সদস্যদের পাঠিয়ে মানুষকে অত্যাচার–নির্যাতন করেন। গোলজারের সুদ চক্রের জালে জড়িয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। সহায়–সম্বল হারিয়ে ভিটাছাড়া অনেক পরিবার।

সম্প্রতি সুদের টাকা পরিশোধকে কেন্দ্র করে এক গৃহবধূকে মধ্যরাত পর্যন্ত বাঁশবাগানে বেঁধে নির্যাতন করেন গোলজার ও তাঁর সহযোগীরা। পরে গৃহবধূর স্বজনেরা টাকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এ ঘটনায় স্ত্রীকে বেঁধে রেখে অপমান করায় ওই গৃহবধূর স্বামী লোকলজ্জায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে সুদ ব্যবসায়ী গোলজার হোসেনকে আটক করে গৃহবধূর করা আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়। আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ।

টাইলস শ্রমিক থেকে সুদ ব্যবসায়ী
সরেজমিনে গাবতলীর চকবেড়া গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক আকামদ্দিন প্রামাণিকের সন্তান গোলজার। শৈশব থেকে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সাত ভাই–বোনের মধ্যে বড় ভাই শ্যালো ইঞ্জিন মেরামত করতেন। আরেক ভাই এখনো রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। অন্য এক ভাই ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সবার ছোট গোলজার একসময় টাইলস মিস্ত্রির সহকারী ছিলেন। আট বছর আগে পুরোনো একটি বাইসাইকেল চালিয়ে বগুড়া শহরে কাজের সন্ধানে যেতেন। সারা দিন কাজ করে ফিরতেন সন্ধ্যায়। চড়া সুদের ব্যবসায় রাতারাতি ভাগ্য খুলে যায় তাঁর।

গাবতলীর গোলাবাড়ি বাজার থেকে ইট বিছানো সড়ক ধরে কাতলাহার বিল। সেখান থেকে মেঠো পথ ধরে এগোলে মালেক বাজার। বাজার থেকে গলিপথ ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ে অজপাড়াগাঁয়ে দৃষ্টিনন্দন ভবন। সামনে বাগানবিলাস। ঘরে লাগানো হয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি)।

এলাকাবাসী জানান, বাড়িটি গোলজারের। তিনি দামি মোটরসাইকেলে চলাফেরা করেন। এক কোটি টাকার বেশি তিনি চড়া সুদে দাদন দিয়েছেন। এক হাজার টাকার জন্য প্রতি মাসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা তাঁকে সুদ দিতে হয়। সুদ দিতে না পারলেই তাঁর বাহিনী দিয়ে যাঁরা সুদে টাকা নিয়েছেন, তাঁদের নির্যাতন করা হয়।

গোলজারের মা গোলেনূর বেওয়া বলেন, তাঁর ছেলে একসময় টাইলস মিস্ত্রির সহকারীর কাজ করতেন। পরে নিজেই বাসাবাড়িতে টাইলসের কাজ চুক্তিতে করে দিতেন। এখন ব্যবসা করেন। ছোট বোন ফারজানা বেগম বলেন, তাঁর ভাই এখনো চুক্তিতে টাইলসের কাজ করেন। আর ভাবি শাহিদা বেগম দাবি করেন, ওই ব্যক্তির ‘আত্মহত্যা’র ঘটনায় গোলজার জড়িত নন। মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।

যা ঘটেছিল গৃহবধূর সঙ্গে
আজ দুপুরে উপজেলার একটি গ্রামে নির্যাতিত গৃহবধূর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। দিনমজুর স্বামীর উপার্জনে সবার মুখে ভাত জুটত। বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে বেশ কিছু ধারদেনা হয়ে যায়। স্বামীও অসুস্থ ছিলেন। এ জন্য গোলজারের কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। চার মাস পর সুদে-আসলে ৭৫ হাজার টাকা দাবি করে বসেন গোলজার। সেই টাকার লাগাতার চাপ দিচ্ছিলেন। টাকার জন্য বাড়িতে এসে হুমকি-ধমকি দিতেন। কূলকিনারা না পেয়ে গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে টাকার জন্য বাবার বাড়ি যাচ্ছিলেন। পথে গোলজার ও তাঁর লোকজন আটক করে রাস্তার পাশে নির্জন বাঁশঝাড়ের মধ্যে নিয়ে আটকে রাখেন।

ওই গৃহবধূ বলেন, ‘অনেক ভয় করছিল। হাতে–পায়ে ধরে কেঁদেছি। আকুতি-মিনতি করেছি। মন গলেনি। পরে বাবা এসে টাকা দিয়ে তাঁকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করে।’ তিনি আরও বলেন, ধারের টাকা শোধ করার পর গোলজার শুক্রবার বাড়িতে এসে তাঁর স্বামীকে গালমন্দ করেন। সেই অপমান সইতে না পেরে স্বামী গলায় ফাঁস দিয়ে রোববার ভোরে ‘আত্মহত্যা’ করেন।

টাকা আদায়ে বাহিনী
এলাকাবাসী জানান, বেড়েরবাড়ি, পার রানীরপাড়া ছাড়াও আশপাশে ১০-১২টি গ্রামের লোকজন দাদন ব্যবসায়ী গোলজার রহমানের চড়া সুদের চক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। গোলজার এসব গ্রামের কয়েক শ বাসিন্দার কাছে কোটি টাকা দাদন খাটাচ্ছেন। টাকা ধার দেওয়ার সময় ফাঁকা চেক, নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেওয়া হয়। এক লাখ টাকা ধার নিতে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা অফিস খরচ দিতে হয়। এরপর প্রতি মাসে ২০-৩০ শতাংশ হারে সুদ আদায় করা হয়। কোনো মাসে সুদ দিতে না পারলে মূলধনের সঙ্গে সেটি যোগ হয়। পরের মাসে মূলধন ও সুদ মিলে ঋণের টাকা আদায় করা হয়। এভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে সুদ। টাকা শোধ দিতে না পারলে গোলজার বাহিনীর ১০-১২ জন সদস্য বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি-ধমকি দেন, বসতবাড়ি দখলের হুমকি দেন, মারধর করেন।

গত ছয় মাসে গোলজারের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার অন্তত ১০টি পরিবার। এর মধ্যে তিনটি পরিবার ভিটেমাটি ছাড়া। পার রানীরপাড়া গ্রামের গৃহবধূ খালেদা বেগম বলেন, তাঁর ছেলে কদম পেশায় রিকশাচালক। কয়েক দিন আগে গোলজারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নেন। প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা সুদ দেওয়ার কথা ছিল। অভাবের কারণে সময়মতো সুদ দিতে পারেননি। মাস তিনেক আগে বগুড়া শহরের বউবাজারে একটি ভাতের হোটেলে গোলজার ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা কদম আলীকে বেধড়ক পেটায়।

গোলজারের সুদ চক্রের জালে নিঃস্ব হয়েছেন পার রানীরপাড়া গ্রামের বাবর আলী, নুরুল ইসলাম, আপেলসহ অনেকে। গ্রামছাড়া হয়েছেন পার রানীরপাড়া গ্রামের নায়েব আলী। তাঁর স্ত্রী হাউসি বেগম বলেন, নায়েব আলীকে মালয়েশিয়ায় পাঠাতে গোলজারের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ধার নেন। সুদে–আসলে ১১ লাখ দাবি করেন গোলজার। দাদনের সেই টাকা শোধ দিতে ১২ শতক জমির ওপর থাকা পাকা বসতবাড়ি বিক্রি করে পুরোটাই গোলজারের হাতে তুলে দিয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছেন।

গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সনাতন চন্দ্র সরকার বলেন, গোলজার সুদের ব্যবসা করে বিপুল অর্থবিত্ত গড়েছেন বলে পুলিশও তথ্য পেয়েছে। গৃহবধূর করা মামলায় ইতিমধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কেউ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *