close(x)
 

ভোটকে কেন্দ্র করে ‘পছন্দমতো’ মাঠ প্রশাসন সাজাচ্ছে সরকার

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

নতুন আটজনসহ চার দিনের ব্যবধানে ২৮ জেলায় নতুন ডিসিগত ৫ দিনে ২৮ জেলায় নতুন ডিসি। নতুন এসপি ১৩ জেলায়। ৪৫ উপজেলায় ইউএনও বদল।

সরকার গত পাঁচ দিনে ২৮ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে সাধারণত জেলা প্রশাসকেরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। তাই নির্বাচনের প্রাক্কালে এসব নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল বেশি থাকে।

এ ছাড়া ভোটের সময় এবং তার আগে পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মাঠ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। গত মাসে পুলিশ সুপার পদেও ১৩ জনের বদলি হয়েছে। একই সময়ে ইউএনও পদে নতুন নিয়োগ পেয়েছেন ৪৫ জন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে, সরকার নির্বাচনের আগে পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে মাঠ প্রশাসন সাজাচ্ছে। এর মধ্যে ডিসি পদে নিয়োগ আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন ডিসিদের মধ্যে সাতজনই বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের একান্ত সচিব (পিএস)। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ১১ জনকে এবার জেলা প্রশাসক করা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নতুন ডিসি নিয়োগ হচ্ছে, ব্যাপারটা তা নয়। এটি রুটিন কাজ। ডিসিদের বিস্তৃত কাজের একটি অংশ হলো নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা।
মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী জ্যেষ্ঠ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

এবার ডিসি পদে নতুন করে ২৭তম বিসিএসের কর্মকর্তাদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২৪ ও ২৫তম বিসিএসের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাও ডিসি হয়েছেন। ডিসি পদে থাকা ২২তম বিসিএসের সব কর্মকর্তাকে তুলে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইতিমধ্যে ডিসি পদে থাকা এই ব্যাচের ২০ জনের মতো কর্মকর্তার বদলির আদেশ হয়েছে। এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের শিগগিরই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য নেওয়া হয়। যার মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি কতটা অনুগত, সেটা বোঝার চেষ্টা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতনের কর্মকর্তার মতে, সাধারণত নির্বাচনের আগে এ ধরনের নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পায়। এরপরও পেশাদারত্ব ও মেধা-যোগ্যতার কারণেও কেউ কেউ নিয়োগ পান। যদিও সে সংখ্যা কম।

 

নির্বাচন এলেই ক্ষমতাসীনেরা তাদের পছন্দমতো নির্বাচনী মাঠ সাজায়। এবারও তাই দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় বাধা।

বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন

 

উপমন্ত্রীর এলাকায় ডিসি হলেন তাঁরই পিএস

৬ জুলাই যে ১০ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের একজন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের পিএস আরিফুজ্জামান। তাঁকে শরীয়তপুরের ডিসি করা হয়েছে। শরীয়তপুর উপমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, আরিফুজ্জামানকে যদি ডিসি করতেই হয়, অন্য জেলায়ও পাঠানো যেত। তাঁকে উপমন্ত্রীর নির্বাচনী আসনে ডিসি করায় সেখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব হবে। এ সিদ্ধান্ত নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। এই কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে এই উপমন্ত্রীর অধীনেই কাজ করেছেন; এখন মাঠ প্রশাসনে উপমন্ত্রীর কথার বাইরে যাবেন কীভাবে?

সাতজন মন্ত্রী-সচিবের পিএস

সাধারণত মন্ত্রী-সচিবের পিএস যাঁরা হন, তাঁদের ক্ষমতাসীনদের অনুগত মনে করা হয়। এমন সাতজন পিএসকে এবার ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব মু. আসাদুজ্জামানকে পাবনা, আইনমন্ত্রীর পিএস নূর কুতুবুল আলমকে পটুয়াখালী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর পিএস আরিফুজ্জামানকে শরীয়তপুর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পিএস খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমানকে কুমিল্লা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের পিএস শাহ্ মোজাহিদ উদ্দিনকে বান্দরবান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের পিএস কায়ছারুল ইসলামকে টাঙ্গাইল এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর পিএস মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদারকে যশোরে ডিসি করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাঁরা কর্মরত, তাঁদের সরকারঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব মন্ত্রণালয় থেকে ১১ জনকে নতুন করে ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে মানিকগঞ্জের ডিসি পদে নিয়োগ পেয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রেহেনা আকতার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সময়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর কয়েকজন ব্যাচমেট (একসঙ্গে চাকরিতে ঢুকেছেন) প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।

সরকার গত পাঁচ দিনে ২৮ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে সাধারণত জেলা প্রশাসকেরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। তাই নির্বাচনের প্রাক্কালে এসব নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল বেশি থাকে।

 বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেও ডিসি

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উপসচিব দেবী চন্দকে হবিগঞ্জে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিসিএস ২৪তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার অতীতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে।

২০১৩ সালে কক্সবাজারের রামুতে ইউএনও পদে থাকার সময় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে অশোভন আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে দেবী চন্দের বিরুদ্ধে। উপজেলা পরিষদের চত্বরে এক দরিদ্র পরিবারের গরু ঢুকে পড়লে দুই দিন ওই গরু আটকে রাখেন তিনি।

পরে গরুটি আনতে গিয়ে দফায় দফায় নাজেহাল ও দুর্ব্যবহারের শিকার হন গরুর মালিক এক নারী ও তাঁর দুই মেয়ে। দুই দিন পর গরু ফিরে পেলেও ওই নারী হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওই ঘটনায় স্থানীয় লোকজন ইউএনওর কার্যালয় ও তাঁর বাসভবন ঘেরাও করেছিলেন। পরের বছর বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ইউএনও থাকার সময়েও এই কর্মকর্তার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ হয়।

৯ জুলাই যে ১০ জনকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাঁদের মধ্যে এই কর্মকর্তাও রয়েছেন।

জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য নেওয়া হয়। যার মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি কতটা অনুগত, সেটা বোঝার চেষ্টা করা হয়।

বিমানের প্রশ্নপত্র ফাঁসে আলোচিত কর্মকর্তা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মেদকে ভোলার ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছর বিমানের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। বিমানের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজাম উদ্দীন ওই নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন। তিনি প্রশ্নপত্র প্রণয়নের যুক্ত ছিলেন। ওই প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির ঘটনায় এই কর্মকর্তাও আলোচিত ছিলেন।

নতুন ডিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ প্রশাসন সাজানোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন ডিসি নিয়োগ হচ্ছে, ব্যাপারটা তা নয়। এটি রুটিন কাজ। ডিসিদের বিস্তৃত কাজের একটি অংশ হলো নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা। তিনি বলেন, যাঁরা মাঠে ডিসি আছেন, তাঁদের দুই বছর দায়িত্ব হয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের মন্ত্রণালয়ে তুলে আনা হচ্ছে। সেখানে নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু কারও কারও ডিসি পদে এক বছরও হয়নি, এমন কর্মকর্তাদের কেন সরিয়ে দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, তাঁদের কাজ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মূল্যায়ন করে। মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

১৩ জেলায় নতুন এসপি

গত ১৩ জুন দেশের ১৩ জেলায় পুলিশ সুপার (এসপি) পদে নিয়োগ-বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে নীলফামারীর এসপি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানকে নরসিংদীতে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার মো. গোলাম সবুরকে নীলফামারীতে, শেরপুরের এসপি মো. কামরুজ্জামানকে নওগাঁয়, বিশেষ শাখার (এসবি) মোনালিসা বেগমকে শেরপুরে, ভোলার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে চাঁদপুরে, ডিএমপির উপকমিশনার আল-বেলী আফিফাকে গোপালগঞ্জে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) মোহাম্মদ আসলাম খানকে মুন্সিগঞ্জে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এসপি এ এইচ এম আবদুর রকিবকে কুষ্টিয়ায়, পুলিশ অধিদপ্তরের মো. ছাইদুল হাসানকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে, পিরোজপুরের এসপি মোহাম্মদ সাঈদুর রহমানকে খুলনায়, স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন-১–এর (এসপিবিএন) মোহাম্মদ শফিউর রহমানকে পিরোজপুরে, এটিইউর মো. মাহিদুজ্জামানকে ভোলায় এবং হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর অঞ্চলের মো. মাহাবুবুল আলমকে শরীয়তপুরের এসপি করা হয়।

তবে এসপি পদে এসব নিয়োগকে ‘নির্বাচনী বদলি’ বলতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা নিয়মিত নিয়োগ-বদলি।’

‘এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে’

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের নিয়োগ–বদলির বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচন এলেই ক্ষমতাসীনেরা তাদের পছন্দমতো নির্বাচনী মাঠ সাজায়। এবারও তাই দেখা যাচ্ছে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় বাধা।’ তাঁর মতে, ‘এখন নির্বাচন চলে গেছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এ জন্য এমন এক সরকার লাগবে, যেখানে নির্বাচনের সময় কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারেন।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *