close(x)
 

রাজধানীতে ভোটার টানতে পারছে না আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগ

একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদে রাজধানী ঢাকায় চারটি আসনে উপনির্বাচন হয়েছে। এই চারটিতে আওয়ামী লীগ জয় পেলেও কোনো আসনেই ভোটার উপস্থিতি ১৫ শতাংশের বেশি হয়নি। অথচ ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের সাধারণ ধারণা, প্রতিটি এলাকায়ই আওয়ামী লীগের ভোটার সমর্থক রয়েছে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। সে হিসাবে এসব নির্বাচনে দলের ভোটারদেরও কেন্দ্রমুখী করতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

গত সোমবার অনুষ্ঠিত ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ১১.৫১ শতাংশ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ এ আরাফাত জয়ী হলেও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নৌকা প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে নানা চেষ্টা করা হলেও ফলাফলে বোঝা গেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেই ভোট দিতে যাননি।

এ বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে বিএনপিও প্রার্থী দিয়েছিল। এর পরও ওই নির্বাচনে মোট ভোট পড়ে ৫.২৮ শতাংশ। একই বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচন হয়।

সেখানে মোট ভোট পড়ে ১০.৪৩ শতাংশ। ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে মোট ভোট পড়ে ১৪.১৮ শতাংশ। তিনটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন।

দলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাধারণ একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে নির্বাচনগুলোতে নৌকাকে হারানোর মতো প্রার্থী নেই। ফলে আমি ভোটকেন্দ্রে না গেলেও নৌকা জিতে যাবে।

এ ধারণার কারণে অনেকে ভোটকেন্দ্রে যান না। আবার উপনির্বাচনে যেহেতু সরকার পরিবর্তন হয় না, সে কারণে সাধারণ ভোটারদের এ নির্বাচন নিয়ে অনীহা থাকে।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদের মেয়াদ আছে পাঁচ মাসের মতো। ফলে এ নির্বাচন নিয়ে মানুষকে আগ্রহী করা কঠিন ছিল। বিএনপি নির্বাচনে না আসায় আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ফলে আমাদের ভোটারদের মধ্যে কেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে অনীহা কাজ করেছে।’

তিনি বলেন, ঢাকা-১৭ আসনের অনেক ভোটার একসময়ে বনানী এলাকায় গার্মেন্টকর্মী ছিলেন। তাঁরা এখন আশুলিয়া বা টঙ্গির দিকে চলে গেছেন। এই সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। আমরা ভোটারদের স্লিপ দিতে গিয়ে বিষয়টি বুঝতে পেরেছি। অভিজাত ধনিক শ্রেণির চেয়ে এই শ্রেণির মানুষদের ভোট নিয়ে উৎসাহ বেশি থাকে। কিন্তু তাঁরা এলাকা বদল করায় ভোট দিতে আসেননি।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মহানগরে আওয়ামী লীগের থানা ও ওয়ার্ড কমিটি নেই। কমিটি না থাকায় সাংগঠনিকভাবে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে কাজ করানো যায়নি। এতে করেও ভোটকেন্দ্রে ভোটার আনতে সমস্যা হয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন পুরনো নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তাঁরা মনোনয়ন না পেয়ে হতাশ হন। ওই সব নেতা এবং তাঁদের বেশির ভাগ অনুসারী নৌকার পক্ষে আন্তরিকভাবে মাঠে নামেনি। কেউ কেউ লোক-দেখানো গণসংযোগ করলেও ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে নীরব ভূমিকায় ছিলেন। এতে করেও ভোটার উপস্থিতি কমেছে।

কমিটি না থাকার প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান বলেন, বিষয়টি নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলেনি। তবে সাংগঠনিক নতুন কমিটি থাকলে তাদের কাজের যে গতি থাকত তার কিছুটা অনুপস্থিতি তো ঘটেছে, এটা স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও ঢাকা-১৭ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নৌকার এত জনপ্রিয়তা যে আমি যেদিকেই গণসংযোগে গেছি দেখেছি নৌকার জোয়ার। ফলে আমাদের নেতাকর্মীদের অনেকের মাথায় একটা চিন্তা ছিল যে নৌকা তো জিতেই যাবে। এমন চিন্তার নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে আনাটাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।’

উপনির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ কম

রাজধানী ঢাকায় শুধু নয়, ঢাকার বাইরের উপনির্বাচনগুলোতেও ভোটার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। তবে ঢাকার বাইরে নির্বাচনগুলোতে ঢাকার তুলনায় বেশ বেশি সংখ্যায় ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ১৪.১৮ শতাংশ। একই দিনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মোট ভোট পড়ে ৫১.৬৩ শতাংশ। একই বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়ে ১০ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু একই দিনে নওগাঁ-৬ আসনের উপনির্বাচনে মোট ভোট পড়ে ৩৬.৪৯ শতাংশ।

এ বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ছয়টি আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অনেকটাই কম ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ভোট পড়ার হার ছিল ১৬.১০ শতাংশ। বগুড়া-৬ আসনে ছিল ২২.৩৪ শতাংশ ও বগুড়া-৪ আসনে ছিল ২৩.৯২ শতাংশ। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে ভোট পড়ার হার ছিল ৪৬.২৯ শতাংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে ভোট পড়ার হার ছিল ২৯.০৮ শতাংশ। গত ৪ জানুয়ারি গাইবান্ধা-৫ আসনে উপনির্বাচনে ৩৮.২৩ শতাংশ ভোট পড়ে।

২০২২ সালের ৫ নভেম্বর ফরিদপুর-২ আসনের উপনির্বাচনে ২৬.২৪ শতাংশ ভোট পড়ে। একই বছরের জানুয়ারিতে টাঙ্গাইল-৭ আসনের উপনির্বাচনে ৩৬.৬৫ শতাংশ ভোট পড়ে। ২০২১ সালের ২ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়ে ২৬.৪৯ শতাংশ।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুন অর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, শহরের লোকেরা গ্রামের চেয়ে বেশ চালাক-চতুর হয়। ভোটাররাও তুলনামূলক সচেতন হয়। তারা মনে করে, উপনির্বাচনগুলো নিয়মরক্ষার নির্বাচন। ফলে অনেকে মনে করে, ভোট দিতে যাওয়া মানে সময় নষ্ট। আর গ্রামের দিকে আঞ্চলিকতা, আত্মীয়তা, ব্যক্তি সম্পর্ক—এসব নানা বিষয় কাজ করে। ফলে ভোটারদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।

ঢাকা-১৭ আসনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ মাস আগে এ নির্বাচন হলো। সচেতন ভোটার মাত্রই জানেন, এ নির্বাচনে যিনি জিতবেন তিনি এলাকার জন্য তেমন কিছুই করতে পারবেন না। আর এ নির্বাচনে ভালো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় দলের নেতাকর্মীরা সেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েননি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *