close(x)
 

মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ শিক্ষামন্ত্রী-শিক্ষক মুখোমুখি

আন্দোলনের অবশ্যই উসকানি আছে -শিক্ষামন্ত্রী

মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ দাবির আন্দোলন নিয়ে এখন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। সোমবার রাজধানীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রী ডা, দীপু মনি বলেছেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের অবশ্যই উসকানি আছে। তিনি কোনো ফাঁদে পা না দিতে শিক্ষকদের আহ্বান জানান। জবাবে শিক্ষকরা বলেছেন, তারা কোনো ফাঁদে পা দেননি। চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সত্ত্বেও তাদের নানাভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গ্রীষ্মের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকদের তালিকা করা হচ্ছে। সর্বোপরি খোদ শিক্ষামন্ত্রীর ইতোমধ্যে দেওয়া বক্তব্যই বড় উসকানি।

গত ১১ জুলাই থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিক্ষকদের এই আন্দোলন চলছে। সোমবার আন্দোলনের দুই সপ্তাহ পূর্ণ হয়েছে। এদিন রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় আহছানুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ডা, দীপু মনি বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষকদের অনেকেই চলে গেছেন। কিন্তু যারা আছেন তারা আরও কিছু দিন বসে থেকে তারপর হয়তো যাবেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে শিক্ষকদের এমন কর্মসূচি পালন একেবারে সঠিক নয়। যেহেতু আলোচনা হয়েছে এবং পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাই তারা ক্লাসে ফিরে যাবেন বলে আশা করছি।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, এ দেশে নির্বাচন এলেই কিছু মানুষ মনে করে- এটা আন্দোলনের মৌসুম। আন্দোলনে অবশ্যই উসকানি আছে। যারা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য নানা রকম অপকর্ম করেছে, যারা জনগণকে সম্পৃক্ত করে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না-তারা একেক সময় একেক দল, গোষ্ঠীর ওপর সওয়ার হচ্ছে। শিক্ষকদের বুঝতে হবে-তাদের ওপর সওয়ার হয়েও আন্দোলনকে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা তাদের থাকতেই পারে। তিনি বলেন, জাতীয়করণের সঙ্গে বড় আর্থিক সংশ্লেষ আছে। কোনটি তাৎক্ষণিকভাবে করা সম্ভব, এটি কিন্তু আন্দোলনকারীদের বুঝতে হবে।

তবে শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন শিক্ষকরা। এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. কাওছার আহমেদ বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যই তো বড় উসকানি। চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি তিনি উসকে দিচ্ছেন। আমরা বাইরের কারও উসকানিতে পা দিচ্ছি না। শিক্ষামন্ত্রীর অনেক উইং আছে। তিনি খোঁজখবর নিতে পারেন। তাছাড়া এখানেও অনেকে নজরদারি করছে। তিনি বলেন, আশা করি আমাদের শোকজ করবে না। আর যদি শোকজ করতেই হয় তাহলে তালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়ার দরকার নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) তারা একটি বই খুলতে পারেন। আমরা গিয়ে সেখানে স্বাক্ষর করে আসব। তাহলে প্রেস ক্লাবে কারা আছি, তা সহজে তারা বুঝতে পারবেন।

কাওছার আহমেদ বলেন, আমরা মাউশি মহাপরিচালককে বলতে চাই, আপনি ও আপনার মন্ত্রী বুঝতে পারেননি-কারা আছে, আর কারা নেই এ আন্দোলনে। এই জাতীয়করণ চায় না কারা-তা বুঝতে আপনারা একটি সমীক্ষা করতে পারেন। সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর একজনও পাবেন না বিপক্ষে। আর যারা বলছেন-অল্প কিছু আছে, তারাও চলে যাবে-এটা ভুল। এটা রুটি-রুজির আন্দোলন। এটা মন্ত্রী এখনো বোঝেননি। যার কারণে তিনি উসকানিমূলক কথা বলছেন।

এই শিক্ষক নেতা জানান, সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। সোমবারও এমন একটি বৈঠক হয়েছে। তারা শিক্ষকদের দাবির ন্যায্যতার ব্যাপারে একমত। যেহেতু আলোচনা অব্যাহত আছে তাই চলমান আন্দোলন অন্য কর্মসূচিতে যাচ্ছে না। অর্থাৎ, আমরা অনশনে যেতে পারতাম। কিন্তু আলোচনা বন্ধ হয়ে গেলে হয়তো এ ধরনের কর্মসূচি আসবে। কিন্তু ফোন করে, তালিকা সংগ্রহ করে বা কৌশল অবলম্বনে শিক্ষকসমাজ ক্ষুব্ধ। কৌশল বন্ধ না করলে শিক্ষকরা কঠোর আন্দোলনে যাবে। তিনি বলেন, অস্তিত্বের এই সংগ্রামে কোনো মহলের কোনো কৌশল কাজে আসবে না। এখন দাবি একটাই-প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান শিক্ষকরা। তার সাক্ষাৎ ছাড়া শিক্ষকরা রাজপথ ছাড়বেন না। শোকজ কেন, অন্য আরও কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিলেও রাজপথ ছাড়ব না আমরা। কোনো পন্থায়ই আমাদের রাজপথ থেকে সরানো যাবে না।

এদিকে সোমবার চৌদ্দতম দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সকাল থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা সড়ক অবরোধ করে কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। কর্মসূচিতে জেলা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষক নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় তাদের স্লোগান ছিল-‘মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, করতে হবে করতে হবে’, ‘চলছে লড়াই চলবে, শিক্ষকরা লড়বে’, ‘এক দফা এক দাবি, মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ’। অনেকে আবার মাথায় দাবি লেখা সংবলিত ব্যাজ পরে কর্মসূচিতে অংশ নেন। এতে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কের পল্টন মোড় থেকে হাইকোর্টের দিকে আসার অংশ বন্ধ হয়ে যায়। বক্তব্য, স্লোগান, গান ও কবিতায় দাবি আদায়ের পক্ষে কথা বলেন শিক্ষকরা। বিটিএর সভাপতি অধ্যক্ষ বজলুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বে কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেখ কাওছার আহমেদ।

আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেন, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী দ্বারা। পরিতাপের বিষয় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া, ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অথচ একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই একাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকে সরকারি শিক্ষকরা অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা পান। আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও এমপিওভুক্তদের পাহাড়সম বৈষম্য রয়েছে। এই বৈষম্যের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *