close(x)
 

আইডিয়ালের ছাত্রীকে বিয়ে করে আলোচনায় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মুশতাক

খন্দকার মুশতাক আহমেদ

ঢাকার মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিয়ে করে আলোচনায় এসেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদ। ৬০ বছর বয়সী মুশতাক এর আগেও দুটি বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কলেজছাত্রীর বিয়ে মেনে নিতে পারেনি মেয়েটির পরিবার। তাদের অভিযোগ, মেয়েকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছেন মুশতাক আহমেদ।

অসমবয়সী দুজনের এই প্রেম ও বিয়ের বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। আজ উচ্চ আদালত এ মামলাসংক্রান্ত শুনানিতে মুশতাক আহমেদকে বলেছেন, নৈতিকভাবে কাজটি তিনি ঠিক করেননি।

সম্প্রতি খন্দকার মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে মেয়েকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের অভিযোগে ঢাকার আদালতে মামলার আবেদন করেন ওই কলেজশিক্ষার্থীর বাবা। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে ৮ আগস্ট গুলশান থানায় মুশতাকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হয়। সেই মামলায় মুশতাকের সঙ্গে কলেজটির অধ্যক্ষ ফাওজিয়া রাশেদীকেও আসামি করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে ‘ফাঁদে’ ফেলে গোপন ভিডিও ধারণ করেন মুশতাক। তাঁর এসব কাজে সহযোগিতা করেন কলেজের অধ্যক্ষ ফাওজিয়া রাশেদী। এ ছাড়া ফাওজিয়া কলেজে ও কলেজের বাইরে বনভোজনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুশতাককে মেয়েটির সঙ্গে আলাদাভাবে মেশার সুযোগ করে দেন। পরে গোপন করা বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাকে বিয়ে করেন।

যেভাবে জানাজানি
মেয়েটির সঙ্গে মুশতাক আহমেদের একাধিক ছবি ও ভিডিও গত জুন মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মেয়েটিকে নিয়ে গাড়িতে ঘুরছেন মুশতাক। কলেজের এক কিশোরী মেয়ের সঙ্গে একই কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যের ঘনিষ্ঠ এসব ভিডিও ও ছবি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এ আলোচনার মধ্যে মুশতাক জানান, কলেজশিক্ষার্থীকে বিয়ে করেছেন তিনি।

গত ২৫ মার্চ ঢাকার বিজয়নগরের একটি কাজী অফিসে তাঁদের বিয়ে নিবন্ধিত হয়। কাজী অফিসের নথি অনুযায়ী, সে সময় মেয়েটির বয়স ছিল ১৮ বছর ১ মাস।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খন্দকার মুশতাক আহমেদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। ঠিকাদার ও ক্লিনিক ব্যবসায়ী মুশতাক ২০২১ সালে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর ঘরে দুই সন্তান রয়েছে। একাধিক নারীর সঙ্গে প্রেমে জড়ানো নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে আগের দুই স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়।

মুশতাকের বিরুদ্ধে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষার্থীকে হয়রানির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাঁদের ভাষ্যমতে, মতিঝিল এলাকার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে কলেজের শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি এবং ভর্তি–বাণিজ্য করছেন মুশতাক।

কলেজছাত্রীকে বিয়ে করার খবর প্রকাশের পর মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি করে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদ। মুশতাক আহমেদের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শাহাদাত ঢালী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুশতাক যে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, এখানে আমার সন্তানেরাও পড়াশোনা করে।’

মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন অভিভাবক। তাঁদের একজন বেলাল উদ্দিন বৃহত্তর মতিঝিল আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। গত সোমবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মুশতাকের বিরুদ্ধে একাধিক মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ রয়েছে। ভর্তি–বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত তিনি।

যা বললেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
কলেজশিক্ষার্থীর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক এবং মেয়েটির পরিবার, অভিভাবক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যের অভিযোগের বিষয়ে শনিবার কথা হয় মুশতাক আহমেদের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে আমাদের পরিচয় হয়। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতাম। সেখানে কথা হতো। এভাবে তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে আমরা বিয়ে করি।’

কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হয়ে একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে, সে বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয় মুশতাক আহমেদের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো খারাপ কিছু করিনি। বিয়ে করেছি। প্রেম তো আর বয়স দেখে হয় না।’

মেয়েটির বাবার ধর্ষণের মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে হয়রানি করতে এই মামলা করেছেন।’ আর ভর্তি–বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

মুশতাকের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর পাশেই ছিলেন তাঁর নতুন স্ত্রী। মুশতাকের মুঠোফোনেই তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের প্রেম, বিয়ে ও তাঁর বাবার মামলা প্রসঙ্গে মেয়েটি বলেন, ‘আমাদের এমন সম্পর্ক হয়তো কোনো মা–বাবা মেনে নেবে না। তাই আমার বাবাও মেনে নিতে পারছেন না।’ মামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এমন মেয়ে নই যে কেউ আমাকে জোর করে কোথাও আটকে রাখবে।’

তবে এই কথা মানছেন না ওই তরুণীর বাবা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে ফাঁদে ফেলে জোর করে এসব করাচ্ছে মুশতাক। তাকে জিম্মি করে যা খুশি তাই বলানো হচ্ছে। এসবের কোনো কিছুই আমার মেয়ে নিজ থেকে করছে না।’ মেয়েকে ফাঁসিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য মুশতাকের ন্যায়বিচার চান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ ফাওজিয়া রাশেদীর সঙ্গে কথা বলতে রোববার কলেজে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। সেখানকার কয়েকজন শিক্ষক জানান, গত ২৮ জুলাই থেকে অসুস্থতাজনিত ছুটিতে আছেন অধ্যক্ষ। পরে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

মেয়েটির বাবার করা মামলাটি এখন তদন্ত করছে গুলশান থানা–পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার শহীদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণের মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। সে অনুয়ায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তাঁরা কলেজটির পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্য ও শিক্ষকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *