close(x)
 

জাতীয়করণ জাতীয়করণ ধ্বনিতে মুখরিত প্রেসক্লাব

আজ প্রেসক্লাবে ১৬ দিনের মতন কর্মসূচি পালন করছে সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ আগত শিক্ষকরা। তাদের একটাই দাবি শুধু জাতীয়করণ। জাতীয়করণ ছাড়া তারা প্রেসক্লাব ছাড়বে না। জাতীয়করণের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমান মিয়া।

বিশ্বের প্রায় সব দেশে শিক্ষকরা সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হলেও আমাদের দেশে তার চিত্র উল্টো। জাতীয় প্রটোকলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকরা বিসিএস ক্যাডারের (প্রশাসন) নিচে অবস্থান করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের তো কোনো পাত্তাই নেই।

দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা; যেখানকার শিক্ষকরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার। একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সরকারি স্কেলের মূল বেতনের ১০০ % পান; সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ এবং মূল স্কেলের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা। শিক্ষা ভাতা, বিনোদন ভাতা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড– কিছুই নেই। পক্ষান্তরে, একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়ি ভাড়া ও উৎসব ভাতা যথাক্রমে বেতনের ৪০ বা ৬০ ও ১০০ শতাংশ, শিক্ষা ভাতা ও বিনোদন ভাতা পেয়ে থাকেন। সেই সঙ্গে তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডও চালু রয়েছে। আমি মনে করি, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মচারীদের উল্লিখিত বঞ্চনা ‘বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ-১৫: মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা, উপধারা (ক), (খ) ও (গ)’ লঙ্ঘন করছে। অথচ প্রতিষ্ঠানের আয় নিয়ে শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরি তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে উল্লিখিত বৈষম্য দূর করা যায়।

সরকারি কলেজের শিক্ষকরা ‘প্রভাষক’ থেকে পদোন্নতি পেয়ে সর্বোচ্চ পদ ধারণ করে ‘অধ্যাপক’ হন। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা ‘প্রভাষক’ থেকে শিক্ষা ক্যাডারের দ্বিতীয় ধাপ ‘সহকারী অধ্যাপক’ পর্যন্ত পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠান কত টাকা আয় করে এবং কত টাকা ব্যয় করে, শিক্ষকদের তা জানার অবকাশ নেই। সরকার শিক্ষকদের ১০০ শতাংশ বেতন দিয়ে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৮০ শতাংশ অবদান রাখে। টিউশনসহ অন্যান্য ফি দ্বারা প্রতিষ্ঠানের তহবিল সমৃদ্ধ হয়। জনশ্রুতি আছে– উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে অবিশ্বাস্য ভাউচার জমা দিয়ে ব্যয় দেখানো হয়। উপরন্তু ফল খারাপ হলে হুমকি-ধমকিসহ আইন-কানুন করে শিক্ষকদের মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রাখা হয়। অবসর গ্রহণের পরও এ শিক্ষকদের ভোগান্তির শেষ নেই। চার-পাঁচ বছর পরও শিক্ষকরা অবসর ভাতা এবং কল্যাণ তহবিলের টাকা হাতে পান না। এ চার-পাঁচ বছর কীভাবে একজন শিক্ষক সংসার চালিয়ে দিনাতিপাত করেন?

বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এগুলো যেন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয় বরং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশনসহ অন্যান্য ফি বাবদ মাসিক ৩০০-৩০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে। অথচ শিক্ষকদের মাসিক ৫০০০-১৫০০০ টাকা পর্যন্ত বেতন দিয়ে থাকে। বেকারত্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দিনের পর দিন একজন মর্যাদাবান শিক্ষককে শোষণ করে আসছেন, আর তারা চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। সমাজের এলিট শ্রেণির ব্যক্তিরা তাদের সন্তানদের এসব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর কারণে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব দিন দিন কমছে। নন এমপিও শিক্ষকদের একটি অংশ– না করেন চাকরি, না পান বেতন। প্রতিষ্ঠানপ্রধান তাদের যোগদান করিয়ে বলে দেন, ‘সময় হলে আপনাকে ডাকব, মাঝে মাঝে এসে প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর নেবেন এবং উপস্থিতির স্বাক্ষর দিয়ে যাবেন।’

এক দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় এত ফারাক থাকতে পারে না। সুতরাং এক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু করলে আপামর জনসাধারণ যেমন লাভবান হবে, তেমনি দেশে দুর্নীতিও কমবে।

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ‘শিক্ষা’ সরকারের একটি অগ্রাধিকার খাত। এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে শিক্ষকরাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীকরণ সময়ের দাবি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *