খাইয়ে ছবি তোলা ‘নিম্ন মানের মশকরা’, বললেন গয়েশ্বর

কর্মসূচি থেকে উঠিয়ে নেওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আপ্যায়িত হওয়ার ছবি-ভিডিও নিয়ে মুখ খুলেছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

একে ‘নোংরা নাটক’, ‘নিম্ন মানের মশকরা’ আখ্যায়িত করে ক্ষোভ ঝেড়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলে এক দফার আন্দোলনে নামা বিএনপি শনিবার ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থানের কর্মসূচি দিয়েছিল।

নয়া বাজারে সেই কর্মসূচি পালনে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল গয়েশ্বর রায়। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাধায় নয়া বাজারে দাঁড়াতে না পারার পর ধোলাইখালে তারা সড়কে নামলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সংঘর্ষে আহত অবস্থায় গয়েশ্বরকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। চার ঘণ্টা পর তাকে নয়া পল্টনে দিয়ে আসে পুলিশ।

এর মধ্যেই ডিবি কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন-অর রশীদের সঙ্গে গয়েশ্বরের মধ্যাহ্ন ভোজের একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

তা নিয়ে শনিবারই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একদিন পর নয়া পল্টনে নিজের চেম্বারে তা নিয়ে কথা বললেন গয়েশ্বর।

পুরো ঘটনাটি সাজান হয়েছিল দাবি করে তিনি বলেন, “স্ক্রিপ্টটা কে লিখেছে, তা তো জানি না। আমি একেক সময় একেকটা অভিনয় করেছি আরকি বলা যায়, স্ক্রিপ্টের আওতায়।”

গয়েশ্বরের মুখে ঘটনাক্রম

পুরো ঘটনাটি সাংবাদিকরা জানতে চাইলে গয়েশ্বর বলেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “ওরা (পুলিশ) টিয়ারগ্যাস মারছে, ওরা ইট ছুড়ছে। ওদের ছোড়া ইট হয়ত কখনও কখনও আমাদের কর্মীরা ফেরত দিছে। আমি বলছি না, পাল্টা ইট ওদের দিতে ছোড়ে নাই কেউ। এদিকে ইট ছুড়তেছে, একদিকে টিয়ারগ্যাস মারতেছে, আরেকদিকে ছররা গুলি মারতেছে।

“তার মধ্যেও ওই পলওয়েল মার্কেটে ড্রেস কিনতে পাওয়া যায়, এরকম ড্রেস পরা লোকের অভাব দেখি নাই। টি-শার্ট পরা, পায়ে স্যান্ডেল। পুলিশ কখনও স্যান্ডেল পরে রাস্তায় নামে না। কিন্তু ধোলাইখালে পুলিশের ওখান থেকে যারা ইট-ঢিলা মারছিল, স্যান্ডেল পরা অনেক লোক আমরা দেখতে পেয়েছি। কীভাবে কর্মীদেরকে মেরেছে, আমাকে লাঠি দিয়ে মেরেছে, সব মিডিয়াতে আপনারা দেখেছেন। একটা লাঠির আঘাতে আমি মাটিতে পড়ে গেছি, এরপরও লাঠি দিয়ে মেরেছে… অর্থাৎ মনে হয় সাপ-টাপ মারছে।”

তারপর পুলিশ তাকে ধরে নেয় জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাকে নিয়ে গেল। ওসি বলল- ‘উপরের নির্দেশ আছে, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।’ আমি ধরে নিলাম, আমি অ্যারেস্ট। আমি বললাম ঠিক আছে চল।”

সেখান থেকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয় বলে জানান গয়েশ্বর।

তিনি বলেন, “নিচে থেকে উপরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে কষ্ট করে তার (ডিবি প্রধান) কক্ষে গেলাম। বললো যে, সারাদিন তো স্যার কিছু খান টান নাই। শুনলাম পানিও নাকি খান নাই। না খেলে কি স্যালাইন নেবেন? যা আছে একটু খেলে নেন। আমাদেরও তো দায়িত্ব আছে, আপনাকে না খাইয়ে রাখা যায় না। অ্যারেস্ট করলেও দায়িত্ব আছে, অ্যারেস্ট না করলেও দায়িত্ব আছে।

“তো দরজা খুলে ড্রাইনিং রুমে নিয়ে গেল। দেখলাম টেবিলে খাওয়া সাজানো। আমি বললাম এগুলো কীসের খাওয়া? গেস্ট কে? আমি তো এসব খাই না। হোটেল সোনারগাঁওয়ের খাওয়া, কোনো হোটেলের খাওয়া তো আমি খাই না। আমি মোর দ্যান ৯০% ভেজিটেরিয়ান। তখন দেখছি যে, ছবি তুলতেছে। আমি বললাম, তোমরা ছবি তুলতেছ কেন? এটা তো কোনো ভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে না খাওয়ার সময়ে ছবি তোলা।”

গয়েশ্বর বলেন, “এসময়ে ডিসি (অতিরিক্ত কমিশনার হারুন) সাহেব বললেন- ‘এই, আমার বাসার খাওয়া আইছে না, তাড়াতাড়ি আন’। একটা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে খাবার আনল। ছোট ছেলেটাও সাথে আসলো, পরিচয় করিয়ে দিল। তখন হারুন বলল- ‘স্যার এটা আমার বাসার রান্না’। চামচ দিয়ে ওই টিফিন ক্যারিয়ার থেকে দুই চামচ ভাত তুলে দিল। আমি বললাম সবজিটা দেখা যায়, সবজিটা দাও। আর কিছু লাগবে না, এটাই চলবে। সে বলল- ‘স্যার, কিশোরগঞ্জের তাজা রুই মাছ, এক টুকরা মাছ খান আপনি’। এই এক পিস মাছ আর সবজি, এটাই .. ।

“আমার কথা হল, এর আগে ডিবি অফিস আমি বহুবার গেছি। না খাইয়ে রাখে নাই। আশপাশের হোটেল থেকে রুটি, মাছ বা মুরগির মাংস … সীমিত। কিন্তু এই যে হোটেল সোনারগাঁও থেকে এত টাকা খরচ করে অ্যারেজমেন্ট, এই ফান্ড কে দেবে তাদের? এটা তাদের নিয়ম আছে কি না? যাদেরকে কাস্টডিতে নেয়, তাদের সাথে এই আচরণ করে কি না? তাহলে গতকাল এই আচরণটা করেছে ছবি তুলে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য। মানে মানুষকে জানানো।”

খাওয়ার পর একটি কাগজে সই নেওয়া হয় জানিয়ে গয়েশ্বর বলেন, “টাইপ করা কাগজে লেখা আছে ‘আমি অমুক অমুক… ডিবি কার্যালয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল, আবার পরবর্তী পর্যায়ে ডাকলে যাব’। নিচে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য বললেন ডিবি প্রধান। আমি বললাম, তোমার সাথে কোনো আলাপ হল না। হারুন বলল- ‘স্যার, এটাই আলাপ, এটা ফরমালিটিজ সবই বোঝেন, সাইন করে দেন’। আমি বললাম, সাদা কাগজ আরও ১০টা আন, আমি দিয়ে দিই।”

‘গয়েশ্বরের মাথা কিনবে? এত টাকা নাই’

এই ঘটনা নিয়ে গয়েশ্বর বলেন, “এটা আমার মনে হয় যে, খুব নিম্ন মানের মশকরা। বাংলাদেশে যারা জেল খাটছে, বহু মরহুম হয়ে গেছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে … তাদেরকে কি এই ধরনের খাবার পরিবেশ করা হয়েছিল?

“এই যে অস্বাভাবিক আয়োজন, ছবি তোলা… দে হেভ এ সাম ইন্টেশন। এই ইন্টেশন পজেটিভ না নেগেটিভ, এটুকু যাছাই-বাছাইয়ের ক্ষমতা এদেশের মানুষের আছে। বাংলাদেশের মানুষ্ এত নির্বোধ না “

তিনি বলেন, “এই যে নোংরা নাটক, খাওন-দাওন সোনারগাঁও কেন? রাষ্ট্রের এত টাকা হয় নাই গয়েশ্বর রায়ের মাথা কিনবে?

“রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে একটা গুলি করে মেরে ফেলতে পারে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে ইলিয়াস আলীর মতো আমাকে গুম করে দিতে পারে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে চৌধুরী আলমের মতো আমারে গুম করে দিতে পারে, বাট গভর্নমেন্ট হ্যাজ নট অ্যানি ক্যাপাসিটি টু পারচেইজ লাইক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।”

সকালে লাঠিপেটা করে দুপুরে আপ্যায়নের ছবি প্রকাশের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির কারণে বলে মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে গয়েশ্বর বলেন, “তারা (যুক্তরাষ্ট্র) কিন্তু বোঝে, তারা এত অবুঝ না। তাদেরও লোকজন এখানে আছে। হয়ত প্রতিবেশীরা (ভারত) তাদের (সরকার) অপরাধ না দেখতে পারে।

“এক সময় বিদেশিরাও প্রতিবেশীদের কারণে তাদের অপরাধ চোখে দেখে নাই। এখন বিদেশিরা নিজের চোখে তাদের অপরাধগুলো দেখতেছে, বুঝতেছে এবং গণতন্ত্রের কথা বলতেছে, মানবাধিকারের কথা বলতেছে।”

সকালে অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকার আদালতে হাজিরা দেন গয়েশ্বর । দুপুরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল তার সঙ্গে দেখা করেন এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। সারাদিনই নেতা-কর্মীদের অনেকে গয়েশ্বরকে তার চেম্বারে দেখতে আসেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *