close(x)
 

জাতীয়করণের দাবির সময়োপযোগিতা ও যৌক্তিকতা

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা একই ধরনের হওয়া উচিত। সেখানে পাঠক্রম থেকে শিক্ষক সবই একই মানের হওয়া প্রয়োজন। সেটা না হওয়ায় এই সংকট।

গত ১১ জুলাই থেকে মাধ্যমিকের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা তাদের ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বা সরকারি করার জন্য আন্দোলন করছেন। বাংলাদেশে ২১ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তার মধ্যে ৬৮৪টি সরকারি। বাকিগুলো এমপিওভুক্ত অথবা বেসরকরি। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পাঁচ হাজার ৫০০। তাদের মূল বেতন সরকার দেয়। তবে অন্যান্য ভাতা ও সুবিধা নামমাত্র। তাদের শিক্ষক সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি।

মাধ্যমিকের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা চাকরিতে যোগদানের শুরুতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন পান। এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া, মূল বেতনের শতকরা ২৫ ভাগ উৎসব ভাতা এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। তাদের কোনো পেনশন নেই। মূল বেতন থেকে শতকরা ১০ ভাগ কেটে নেয়া হয়। এছাড়া কল্যাণ ফান্ড আছে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা হয়েছে। তারপরও এখনো বেসরকারি প্রাথকি বিদ্যালয় আছে। আর এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত নয়, অনুদানভুক্ত। সাড়ে সাত হাজার এবতেদায়ী মাদ্রাসার মধ্যে অনুদানভুক্ত আছে এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসা। অনুদানপ্রাপ্ত মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাসে পান দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারি শিক্ষক পান দুই হাজার ২০০ টাকা।

বেসরকারি স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্ত বা সরকারি করা গত পাঁচ বছরেই সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সরকারের একটি নীতি হলো, প্রত্যেক উপজেলায় কমপক্ষে একটি মাধ্যমিক স্কুল এবং একটি কলেজ সরকারি করা হবে। তা এরইমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে।

বাংলাদেশে বেসরকারি স্কুল এমপিওভুক্ত করা, এমপিওভুক্ত স্কুল সরকারি করা নিয়ে শিক্ষকরা বছরের পর বছর আন্দোলন করে এসেছেন। তার ফলও তারা পেয়েছেন। যেমন ২০২২ সালে দুই হাজার ৭১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়। আর ২০১৯ সালে এমপিওভুক্ত করা হয় দুই হাজার ৭০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালের আগে করা হয় এক হাজার ৬২৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখন দাবি মাধ্যমিকের সব স্কুল সরকারি বা জাতীয়করণ করা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার কতগুলো শর্ত আছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের ন্যূনতম যোগ্যতা এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা অন্যতম। একটি বিষয় বাংলাদেশে নিশ্চিত করা গেছে। আর তা হলো, এমপিওভুক্ত কোনো স্কুলের শিক্ষক হতে হতে হলে অবশ্যই বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এজন্য সরকারের বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ(এনটিআরসি) আছে। প্রতিবছরই এই পরীক্ষা হয়।

মাধ্যমিকের যেসব শিক্ষক আন্দোলনে আছেন, তারা মনে করেন, সমান যোগ্যতা নিয়েও তারা কম বেতন পান। সরকারি করলে খরচও তেমন বাড়বে না বলে মনে করেন তারা।

তারা বলছেন, বর্তমানে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে এক কোটি ৬২ লাখ, ৬৩ হাজার ৭২৪ জন। তাদের সবার কাছ থেকে যদি গড়ে ৭৫ টাকা করে বেতন আদায় করা হয় তাহলে মাসে ১২২ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে যোগ হবে। এর সাথে আরো যোগ হবে ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফিসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পত্তি থেকে বার্ষিক আয়। বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪০২ কোটি ৪৯ লাখ ৩০০ টাকা রিজার্ভ রয়েছে, যা সরকারের কোষাগারে যাবে জাতীয়করণ করা হলে। তা ছাড়া এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরে কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা আয় করে নিজস্ব সম্পত্তি থেকে। এটাও পাবে সরকার।

বর্তমানে সরকারি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী বেতন ১২ টাকা, নবম থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত ১৮ টাকা আর একাদশ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ২৫ টাকা। গড় বেতন ১৫ টাকা। আন্দোলনরত শিক্ষকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয়করণ করা হলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বেতন হবে ৫০ টাকা। নবম থেকে দশম পর্যন্ত বেতন ৭৫ টাকা। একাদশ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত বেতন ১০০ টাকা। শিক্ষার্থী প্রতি গড় বেতন দাঁড়ায় মাসে ৭৫ টাকা।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির(বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক শেখ কাওসার আহমেদ বলেন,” আমরা হিসাব করে দেখিয়েছি আমাদের সরকারি করলে সরকারের বাড়তি তেমন খরচ হবেনা। শিক্ষার্থীদের বেতনও সবার সমান হবে। এখন বেসরকারি পর্যায়ে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন আছে।”

তার কথা, “আমরা তো পাঁচটি শর্ত পুরণ করে এমপিওভুক্ত হয়েছি। যারা শর্ত পুরণ করতে পারেনি, তারা তো এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। সুতরাং আমাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।”

তিনি বলেন, “সরকার এরই মধ্যে ৩৭০টি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩৪০টি কলেজ জাতীয়করণ করেছে। সুতরাং নতুন করে কোনো নীতিমালা করার দরকার নেই। ওইসব প্রতিষ্ঠান যে নীতিমালায় সরকারি করা হয়েছে, আমাদেরও সেই নীতিমালায় করা হোক। শিক্ষামন্ত্রী দুইটি কমিটি করার কথা বলেছেন। সেই কমিটিতে আমাদেরও রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের রাখতে চাচ্ছে না মন্ত্রণালয়। তাই আমরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমাদের কথা বলতে চাই।”

শিক্ষকদের আরেকটি সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস)-এর সভাপতি নজরুল ইসলাম রনি বলেন, “যারা সরকারি শিক্ষক, তারা ১৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন দিয়ে চাকরি শুরু করেন। দুইটি উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের সমান। মূল বেতনের শতকরা ৪৫ ভাগ বাড়ি ভাড়া পান। ঢাকা শহরে ৫০ ভাগ। তারা মাসে চিকিৎসা ভাতা পান এক হাজার ৫০০ টাকা। তাদের পেনশন আছে। এখানেই আমাদের সঙ্গে বৈষম্য স্পষ্ট।”

তার কথা, “আমরা সরকারের জাতীয়করণের ঘোষণা চাই। এটা ঘোষণা করলেও তো যাচাই বাছাই করতে অনেক সময় লাগবে।”

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি বলেছেন, “নির্বাচনের আগে তাদের দাবি বিবেচনায় নেয়া সম্ভব নয়। জাতীয় নির্বাচনের পর দেখা যাবে। ” তার কথা , “যারা আন্দোন করেছেন, তারা এমপিওভুক্ত। তারা আগে বেসরকারি ছিলেন। গত সাড়ে চার বছরে সাড়ে পাঁচ হাজার মাধ্যমিক স্কুল এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এখন তারাই জাতীয়করণ বা সরকারি হতে চাইছে। কিন্তু এটা অনেক জটিল, কারণ, এখানে যোগ্যতার প্রশ্ন আছে। এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভিন্নতা আছে। শিক্ষার মান নিয়ে কথা আছে। সবার যোগ্যতা এক নয়। যারা শিক্ষা ক্যাডারের তারা নন-ক্যাডারের সঙ্গে এক জায়গায় আসবেন কিনা। তাই দুইটি কমিটি করা হয়েছে পুরো বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য। তারা দেখবেন কীভাবে কী করা যায়। তবে এতে অনেক সময় লাগবে। ”

তিনি আরো বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারের খরচের দিকটাও দেখতে হবে।” বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সরকারকে চাপে ফেলে শিক্ষকরা দাবি আদায় করতে চাইছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘শিক্ষার একটা নীতি হলো প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। এখানে কোনো বৈষম্য বা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা থাকা ঠিক না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে সেই বৈষম্য আছে। এটা শুধু শিক্ষক নয়, শিক্ষার্থীর জন্যও বৈষম্য।”

তার কথা, “মাধ্যমিকের এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক তবে এটা ঢালাওভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। সরকার এই প্রতিষ্ঠান গুলোর মান যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারে। একটি মানদণ্ড তৈরি করে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও দেখতে হবে।”

আর জাতীয় শিক্ষা নীতি কমিটির সদস্য এবং প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, “সবার আগে মনে রাখতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কারো কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে তোলা হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় শিক্ষার জন্য। তাই মান সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তবে যিনি শিক্ষা দেন, সেই শিক্ষককে অর্থনেতিক স্বস্তি দিতে না পারলে তার কাছ থেকে ভালো শিক্ষা আমরা আশা করতে পারি না।”

তিনি বলেন, “একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা হওয়ার কথা। সেটা হলে আর এই ধরনের সমস্যা হতো না। আমাদের এখানে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয়করণ করতে হবে। তা না হলে এই বৈষম্য থাকবেই। এখানে নানা ধরনের শিক্ষা প্রচলিত। ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে যা-ই করা হোক না কেন, শিক্ষার মান আগে নিশ্চিত করতে হবে।” সূত্রঃ ডয়েচে ভেলে

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *