close(x)
 

‘জ্বরে যখন ছেলে কান্না করে সহ্য করতে পারি না’

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্তরা

# রোববার (১৬ জুলাই) ৫০৩ জন রোগী মুগদা হাসপাতালে ভর্তি আছেন

#চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ১৪ জন, জুনে ১৫ জন ডেঙ্গুরোগী মারা গেছেন

#টেস্টের রেজাল্ট দেরিতে পাওয়ায় চিকিৎসা সময়মতো হচ্ছে না

দক্ষিণ বনশ্রীর তিতাস রোডের একটি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণির ছাত্র মো. আহমদ উল্লাহ (৬)। গত বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) থেকে তার জ্বর। পরীক্ষায় একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও টাইফয়েড ধরা পড়ে। পরীক্ষার এমন রিপোর্ট পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন বাবা মো. শাহজাদা। পরে গত শুক্রবার (১৫ জুলাই) মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন ছেলেকে।

রোববার (১৬ জুলাই) মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নয় তলায় নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শয্যার পাশে বসে ছেলে আহমদ উল্লাহর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন বাবা শাহজাদা। ছেলের কী খেতে মন চায়, এখন কেমন লাগছে তা বারবার জানতে চাইছেন।

আলাপকালে শাহজাদা বলেন, ছেলের জ্বর আসার পর থেকে তাকে নিয়ে ছোটাছুটি করছি। জ্বরে যখন কান্না করে তা সহ্য করতে পারি না।

শনির আখড়ার জাপানি গলিতে একটি বাসায় ভাড়ায় থাকেন রাশেদা আক্তার। চারদিন আগে তার ছয় বছরের মেয়ে সুমাইয়া নূর (৬) ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। আজ তিনদিন ধরে হাসপাতালে মেয়েকে নিয়ে থাকছেন তিনি। আলাপকালে রাশেদা বলেন, পরিবারে প্রথমে শাশুড়ি নূর জাহান ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। এর দু’দিন পর মেয়ে সুমাইয়ার জ্বর আসে। এ নিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যরা আতঙ্কে আছেন।

রাশেদা আক্তারের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল পাশের শয্যায় শুয়ে কান্না করছিল শনির আখড়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আড়াই বছরের মোস্তাকীন। দেখা যায়, তার হাতে ক্যানুলা লাগানো। পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন মা সোনিয়া আক্তার। আলাপকালে সোনিয়া জানান, ছেলের জ্বর আসার পর থেকে বুকের দুধ ছাড়া আর কিছুই খেতে পারছে না। কয়েক দিনের জ্বরে ছেলের ওজনও কমে গেছে। শনির আখড়ার ঘরে ঘরে ডেঙ্গুরোগী। ডেঙ্গু আতঙ্কে অনেকে গ্রামে চলে গেছেন। অনেকে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

এই চিত্র রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতালে। ঢাকার সঙ্গে সারাদেশেই প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। রোববার (১৬ জুলাই) বেলা ১১টা পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালে ৫০৩ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে ১১৯ জন শিশু। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় এ হাসপাতালে ১৬০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে একজন রোগী আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে চলতি (জুলাই) মাসে ভয়াবহ আকার ধারণ করে ডেঙ্গু। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ৪৫৪ জন।

চিকিৎসাসেবা নিয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক মো. নিয়াতুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, চলতি মাসে বিগত যে কোনো বছরের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছেন। সাধ্যমতো তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এখন হাসপাতালের আলাদা চারটি ফ্লোরে (দুটি পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ, একটি নারী ও একটি শিশু ওয়ার্ড) পুরোদমে চিকিৎসা চলছে। কয়েকটি শিফটে ভাগ করে চিকিৎসা দিচ্ছেন হাসপাতালটির ৪৫ জন চিকিৎসক।

তিনি বলেন, এ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত যে কয়েকজন রোগী ডেঙ্গুতে মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশই বয়স্ক। আর চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ঢাকার বাইরের। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী ঢাকার।

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত জুনে এক হাজার ৮৯০ জন নতুন রোগী মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত ১৬ জুলাই পর্যন্ত এক হাজার ৮৯০ জন নতুন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে এসেছেন। এছাড়া গত মাসে এখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ জন মারা গেছেন। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১৪ জন। এই হিসেবে গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি এবং মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শনিবার (১৫ জুলাই) রাতে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন টিকাটুলীর বাসিন্দা হাসানুজ্জামান। তিনি মতিঝিলের দিলকুশার একটি মসজিদের ইমাম। রোববার (১৬ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে বসে আছেন হাসানুজ্জামান। তার হাতে স্যালাইন চলছে। এর মধ্যে কোলে তার দুই বছরের মেয়ে। পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন তার স্ত্রী। মাথার ওপর বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় ঘামছিলেন।

আলাপকালে হাসানুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, গত শুক্রবার হঠাৎ করে জ্বর আসে। শনিবার সকালে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হই।

দুদিন আগে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দক্ষিণ বনশ্রীর মো. আনারুল। তিনি পেশায় একজন ভ্যানচালক। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর তার স্ত্রী তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। এখন তার বড় ভাই গ্রাম থেকে এসে তাকে হাসপাতালে দেখাশোনা করছেন। আনারুল বলেন, আমি যে বাসায় পরিবার নিয়ে থাকি তার আশপাশের আরও কয়েকটি বাসায় ডেঙ্গুরোগী রয়েছেন। তারাও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাসার পাশে জমে থাকা পানিতে মশা জন্মায়। কিন্তু সিটি করপোরেশনের লোকজন সেখানে ওষুধ দেয় না। ফলে ওই এলাকার অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

দুপুর ১২টায় শিশু ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে রোগীদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেলেন চিকিৎসক মাহমুদা খান। তিনি জানান, তারা সাধ্যমতো চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শয্যার তুলনায় হাসপাতালে রোগী তিনগুণ বেশি। এজন্য চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।

ডেঙ্গু পরীক্ষায় যত দুর্ভোগ

শনিবার (১৫ জুলাই) বিকেলে ডেঙ্গু পরীক্ষার নমুনা দেন মানিকনগরের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম। আজ সকাল ১০টায় তার রিপোর্ট দেওয়ার কথা। কিন্তু যথাসময়ে তার এক স্বজন কাউন্টারে রিপোর্ট আনতে গেলেও সেই রিপোর্ট হাতে পান দুপুর ১২টায়। রিপোর্টে ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ে।

রবিউল ইসলাম জানান, তিনি যে বাসায় ভাড়া থাকেন, সেখানে আরও কয়েকজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তাই জ্বর আসার পরপরই হাসপাতালে ছোটেন। কিন্তু রিপোর্ট না পাওয়ায় আগ থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিচ্ছিলেন না চিকিৎসকরা। রিপোর্ট যদি সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যেত, তাহলে চিকিৎসা আরও আগে পেতেন।

রবিউল ইসলামের মতো আরও অনেকে ডেঙ্গুসহ অন্য পরীক্ষার রিপোর্ট দেরিতে পাওয়া, রিপোর্টের জন্য কাউন্টারে টাকা জমা দিয়ে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানান। তবে যে কাউন্টারে রিপোর্ট দেওয়া হয়, সেখানকার কর্মীরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক নিয়াতুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, সাধারণ সময়ে হাসপাতালে যে জনবল থাকে, সেই একই জনবল নিয়ে এখন চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে রোগীদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। জনবল বাড়িয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।

রোববার (১৬ জুলাই) দুপুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এ বি এম খুরশীদ আলম বলেন, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুরোগী ভর্তি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমরা যথাসাধ্য চিকিৎসাসেবা দিতে চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, মুগদা হাসপাতালের আশপাশের জোনগুলো যেমন শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, কদমতলি, বাসাবো, মুগদা থেকে শুরু করে রামপুরা পর্যন্ত পুরো এলাকায়ই ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা বেশি। এসব রোগীর বেশিরভাগই মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সেখান থেকে কিছু রোগী অন্যত্র সরিয়ে নিতে। কিন্তু রোগীরা রাজি হননি। তারা তাদের বাসাবাড়ির কাছাকাছি থেকেই চিকিৎসা নিতে চান।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *